আমরা যখন গুগল ম্যাপ দেখি তখন মনে হবে গ্রিনল্যান্ড আর আফ্রিকার মহাদেশ কাছাকাছি আকৃতির। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আফ্রিকার মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়। ম্যাপ দেখে সেটা বুঝা যায় না। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের ম্যাপে বাঁকা দূরত্বকে সমতল পৃষ্ঠায় দেখানো হয়। গুগল আর্থ বের করে দেখলে এই ব্যবধান বুঝা যায়। একই ভাবে আরেকটা প্রকাশ্য পার্থক্য হচ্ছে, চিন ও অস্ট্রেলিয়ার দূরত্ব। গুগল ম্যাপে বা প্রচলিত ম্যাপে দেখা যায় চিন থেকে অস্ট্রেলিয়া অনেক দূর। কিন্তু গুগল আর্থে দেখা যায় অতোটাও দূরে না।

আমরা যে দ্বিমাত্রিক মানচিত্র ব্যবহার করি তা সেই ১৫৬৯ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিলো। সে বছর বেলজিয়ামের গণিতবিদ জেরার্ডাস মারকেটর এই মানচিত্রটি অঙ্কন করেন। মানচিত্রটি ছিলো নানা খুঁটিনাটি তথ্যে ভরপুর। মানচিত্রের ইতিহাসে সে ছিলো যুগ পরিবর্তনকারী এক ঘটনা। এর আগে যেসকল মানচিত্র ছিলো সেগুলো কোনোটাই পূর্ণাঙ্গ বা কাছাকাছিও ছিলো না। ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হতো বিশ্বাসের মানচিত্র। যেমন, কোনো ম্যাপে হয়তো জেরুজালেমকে কেন্দ্রে স্থাপন করে মিডলইস্ট বা ইউরোপ পর্যন্ত অঙ্কণ করা হতো সীমানা। অথবা শুধু পশ্চিম ইউরোপকে নিয়েই আঁকা হতো মানচিত্র।

পৃথিবীর ইতিহাসে সময়টা তখন ছিলো নাবিকদের যুগ। ইউরোপ থেকে সাম্রাজ্যবাদীদের বড় বড় জাহাজ ছুটে যেতো পৃথিবীর সকল প্রান্তে। জমি আবিষ্কার ও দখলের নেশায় ইউরোপ তখন বুঁদ। মানচিত্রের প্রয়োজন ছিলো সেখানে। যেমন- ১৪৯২ সালে যখন কলম্বাস আমেরিকা পৌঁছালেন তখন আমেরিকা কোনো ম্যাপে ছিলো না। মূলত আমেরিকায় ইউরোপিয়ানদের পা পড়ার পর থেকেই আগে থেকেই শুরু হওয়া মানচিত্র অঙ্কনের বিপ্লব নতুন মাত্রা পায়। মানচিত্রের আকার প্রসারিত হতে থাকে। ম্যাপশিটের সেই কোনাগুলো আঁকা শুরু হয়ে যায় যেগুলো এতোদিন ফাঁকা ছিলো।

ইউরোপের পশ্চিম থেকে রসদ বোঝাই জাহাজগুলো যখন ছেড়ে যেতে শুরু করলো তখন প্রয়োজন পড়লো আরো আধুনিক এক মানচিত্রের। শুধু তারা দেখে নয়, বরং একেবারে হাতের মুঠোয় বা টেবিলে ছড়ানো ম্যাপ দেখেই বুঝা যাবে জাহাজের নাক কোনদিকে চালিত হবে। এমনকি মেঘে ঢাকা অন্ধকার রাতেও যে মানচিত্র দিবে ভরসা। সুতরাং, সমুদ্রের বিশাল প্রান্তরে দিক নির্ধারণ হয়ে উঠলো মানচিত্রের নতুন নিয়ামক।

১৫৬৯ সালে এর প্রথম, পূর্ণাঙ্গ ও প্রায় নির্ভুল সমাধান নিয়ে আসলো জেরার্ডাস মারকেটর। এতোই সঠিক যে, আমরা এখনো এই মানচিত্রই ব্যবহার করি। গুগল ম্যাপও মারকেটর প্রজেকশনই ব্যবহার করে। মারকেটর ব্যবহার পর থেকে নাবিকেরা তাদের দিক নির্ণয়ের একটা বাস্তব সমাধান খুঁজে পেলো। সহজ হয়ে উঠলো সমুদ্রে আরো দূর থেকে দূরে চলে যাওয়া এমনকি সফলভাবে ফিরে আসাও। মজার কথা হচ্ছে, কোটি নাবিকেরা মারকেটরের মানচিত্র ব্যবহার করলেও মারকেটর নিজে নাবিক ছিলেন না।

মারকেটরের মানচিত্র প্রকৃতপক্ষে নির্ভুল ছিলো না। টেকনিক্যালি না, ফিলোসফিক্যালি না, পলিটেক্যালিও না। এর সবচেয়ে বড় বিতর্ক হচ্ছে তিনি উত্তরের দেশগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষিণের পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে করেছেন অবজ্ঞা। অন্তত তার মানচিত্র তাই বলে। এর ফলে সেই সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই বিতর্ক সবচেয়ে বড় করে তুলেন আরনো পিটার্স, ১৯৭৪ সালে। তিনি মারকেটরের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। মারকেটর-পিটার মানচিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলোচনা। এর প্রেক্ষিতে মানচিত্র নির্মাণে বিভিন্ন প্রকেজশন বের হতে থাকে। যেমন, ওয়াটারম্যান মানচিত্র। পৃথিবীর উপরিভাগকে ৮টি ভাগে বিভক্ত করে প্রজাপতির ডানার আকৃতিতে ফেলা হয় এই মানচিত্রে। সবগুলো দেশের আকৃতি ঠিকই থাকে, কিন্তু দিক নির্ধারণ হয়ে উঠে দুরূহ। ইন্টারেস্টিং কিন্তু প্রাকটিক্যাল নয়। তাই, এতোকিছুর পরেও এখনো মারকেটরের মানচিত্রই টিকে আছে স্বমহিমায়।
