সৈয়দ শামসুল হকের ছোটগল্প: পাঠের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি

পোস্টটি শেয়ার করুন:

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক পর্বে সৈয়দ শামসুল হক নিঃসন্দেহে একটি বহুমাত্রিক ও নিরীক্ষাধর্মী নাম। তাঁর ছোটগল্পসমূহ ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। তাঁর রচনাভুবনে প্রবেশ অনেক সময়ই তাৎক্ষণিক নয়; বরং ধীরে ধীরে, এক ধরনের গভীর অনুধ্যানের মধ্য দিয়ে পাঠককে টেনে নেয়—যেখানে প্রাথমিক মুগ্ধতা পরিণত হয় এক ধরনের সাহিত্যিক সচেতনতায়।

সৈয়দ শামসুল হক

জলেশ্বরী এমন এক কল্পিত জনপদ, যার অবস্থান কেবল লেখকের কল্পনায়। সৈয়দ হকের ভাষায় বললে, করোটিতে। রাজাকার, রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, চোর-বাটপার, ধর্মব্যবসায়ী—সব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মিলিয়ে জলেশ্বরী যেন আস্ত এক ছোট্ট বাংলাদেশ। যার পাশ দিয়ে বয়ে চলে আধকোশা নদী। অনেক গল্পের মূল পটভূমি এই জলেশ্বরী, আবার যেখানে এটি সরাসরি উপস্থিত নেই, সেখানেও কোথাও না কোথাও ফিরে আসে এই জনপদ। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যেমন বারবার ফিরে গেছেন তার “মাকোন্দো”র কাছে, তেমনই সৈয়দ হকের কাছে জলেশ্বরীও হয়ে উঠেছে তাঁর নিজস্ব সাহিত্যিক ভূগোল।

আমার ক্ষেত্রে সেই পাঠ-যাত্রার শুরু ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। শ্রদ্ধেয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সম্পাদনায় পড়ছিলাম “সাম্প্রতিক ধারার গল্প” ষাটের দশকের নবীন সম্ভাবনাময় লেখকদের নির্বাচিত গল্প নিয়ে সাজানো সেই সংকলনে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আবদুল মান্নান সৈয়দসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে জায়গা পেয়েছেন সৈয়দ শামসুল হকও। সেই সংকলনের ভূমিকায় আবু সায়ীদ স্যারের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল—“এরা একদিন বাংলা সাহিত্য জগতে রাজত্ব করবে।” ১৯৬৪ সালে দাঁড়িয়ে করা এই মন্তব্য আজও আমাকে বিস্মিত করে। জহুরির চোখ দিয়ে তিনি যে লেখকদের বেছে নিয়েছিলেন, সময় সত্যিই তাদের একেকজনকে বাংলা সাহিত্যের মহীরুহে পরিণত করেছে।

আমার সৈয়দ হক পাঠের সূচনা ঘটে সেই সংকলনেই। “রক্তগোলাপ” গল্পটি পড়ে আমি এতটাই মুগ্ধ, অভিভূত ও বিস্মিত হয়েছিলাম যে সঙ্গে সঙ্গে গল্পটি আবার পড়ি। তারপর অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকি—এভাবেও গল্প লেখা যায়!

গল্পটি তিনি লিখেছেন ১৯৬৩ সালে—ঢাকার এক রেস্তোরাঁয় বসে। সময়-প্রেক্ষাপটটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তখনো তার আলোড়ন তোলা One Hundred Years of Solitude লিখে উঠেননি। ১৯৬৭ সালে যে উপন্যাস প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে আলোচনা শুরু হবে, তারও আগে সৈয়দ হক ঢাকায় বসে এমন একটি গল্প লিখে ফেলেছেন—যেটায় জাদুবাস্তবতার সফল প্রয়োগ সুস্পষ্ট! বিস্ময়কর বৈকি।

সৈয়দ শামসুল হকের লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক তাঁর ভাষা। আভিজাত্যপূর্ণ, গম্ভীর, অথচ একই সঙ্গে কোমল ও প্রবাহমান ভাষা খুব কম লেখকের মধ্যেই পাওয়া যায়। তাঁর গল্প বলার ধরন অনেকটা বৈঠকী—যেন সামনে বসে কেউ রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে, মৃদুস্বরে আপনাকে গল্প শোনাচ্ছে, এক আরামদায়ক শীতের সকালে।

সমষ্টিক গল্প বলার এই রীতি পাওয়া যায় শহীদুল জহিরের গল্পেও। তবে পার্থক্য আছে। শহীদুল জহির যেখানে পাঠককে জটিল বাক্য ও কিন্তু/অথবা/হয়তো/কিংবার অনিশ্চয়তায় ফেলে গোলকধাঁধার ভেতর দিয়ে নিয়ে যান, সৈয়দ হক সেখানে অনেক বেশি সরল, সহজ এবং আপনজনের মতো।

তাঁর লেখার আরও দুটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে—কল্পনার জনপদ “জলেশ্বরী” এবং আঞ্চলিক ভাষার অসাধারণ ব্যবহার।

জলেশ্বরী এমন এক কল্পিত জনপদ, যার অবস্থান কেবল লেখকের কল্পনায়। সৈয়দ হকের ভাষায় বললে, করোটিতে। রাজাকার, রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, চোর-বাটপার, ধর্মব্যবসায়ী—সব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মিলিয়ে জলেশ্বরী যেন আস্ত এক ছোট্ট বাংলাদেশ। যার পাশ দিয়ে বয়ে চলে আধকোশা নদী। অনেক গল্পের মূল পটভূমি এই জলেশ্বরী, আবার যেখানে এটি সরাসরি উপস্থিত নেই, সেখানেও কোথাও না কোথাও ফিরে আসে এই জনপদ। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যেমন বারবার ফিরে গেছেন তার “মাকোন্দো”র কাছে, তেমনই সৈয়দ হকের কাছে জলেশ্বরীও হয়ে উঠেছে তাঁর নিজস্ব সাহিত্যিক ভূগোল।

সৈয়দ শামসুল হকের রচনায় উঠে এসেছে ম্যাজিক রিয়েলিজম

আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারেও তাঁর দক্ষতা অসাধারণ। “পরানের গহীন ভেতর” কিংবা “পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়” নাটকে এর প্রয়োগ যেমন দেখা যায়, তেমনি ছোটগল্পেও তিনি এই ভাষাকে সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক সবসময়ই নিরীক্ষাপ্রবণ লেখক ছিলেন। গল্পের গঠন, আঙ্গিক ও বয়ান নিয়ে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। এর ফলেই আমরা পেয়েছি “রক্তগোলাপ”, “নেপেন দারোগার দায়ভার”, “কোথায় ঘুমোবে করিমন বেওয়া”, “শরবতির পাশ ফেরা”, “কালামাঝির চড়নদার”, “আজহারের মাতৃশোক”—ইত্যাদি অসংখ্য জাদুকরী গল্প।

গ্রামীণ জীবনের গল্প যেমন তিনি তীক্ষ্ণভাবে এঁকেছেন, তেমনি নাগরিক জীবনের গল্প বলাতেও তিনি সমান দক্ষ। তাঁর ভাষা এতটাই আধুনিক যে পঞ্চাশের দশকের লেখার সঙ্গে সমকালীন লেখার তুলনা করলেও বড় কোনো ব্যবধান চোখে পড়ে না।

তবু বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত শক্তিশালী একজন লেখক হওয়া সত্ত্বেও সৈয়দ হকের পাঠকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম মনে হয়। অনেক পাঠক তাঁকে চেনেন “খেলারাম খেলে যা” উপন্যাসের জন্য, কিন্তু তাঁর ছোটগল্পের বিস্তৃত জগৎ সম্পর্কে অনেকেই তেমনভাবে জানেন না।

আমার কাছে সৈয়দ শামসুল হক মূলত একজন অসাধারণ গল্পকার হিসেবেই থেকে যাবেন—যার গল্প পড়ার পরেও একটা দীর্ঘস্থায়ী রেশ রেখে যায়, ধীরে ধীরে অনুভব করা যায়।


পোস্টটি শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *