কার্বোহাইড্রেট কি সত্যিই ওজন বাড়ায়? নতুন গবেষণা কী বলছে?
মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত বিতর্কগুলোর একটি হলো, কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার কি সত্যিই ওজন বাড়ায়? দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, ওজন বাড়ার প্রধান কারণ অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ। অর্থাৎ, আপনি যত বেশি ক্যালোরি খাবেন, ততই আপনার ওজন বাড়বে। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করেছে এবং নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে নিয়ে এসেছে।
গবেষণাটিতে দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের ফলে এমনকি অতিরিক্ত ক্যালোরি না খেয়েও শরীরের ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে। বিষয়টি প্রথমে অবাক করার মতো শোনালেও এর পেছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা।

গবেষণার পটভূমি
এই গবেষণাটি মূলত প্রাণী বিশেষ করে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। গবেষকরা ইঁদুরগুলোর খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। যখন তাদের সামনে বিভিন্ন ধরনের খাবার রাখা হয়, তখন তারা বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য বেছে নেয়।
কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইঁদুরগুলো মোট ক্যালোরির দিক থেকে বেশি খাচ্ছিল না। অর্থাৎ, তাদের মোট খাদ্যগ্রহণ পূর্বের মতোই ছিল ।তবুও তাদের শরীরে চর্বি জমা হতে শুরু করে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়।
মেটাবলিজমই কি তাহলে সব?
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ওজন বৃদ্ধির পেছনে কেবল ক্যালোরি নয়, বরং শরীরের মেটাবলিজম (metabolism) বা বিপাকক্রিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেটাবলিজম বলতে বোঝায়, শরীর কীভাবে খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করে এবং সেই শক্তি ব্যবহার করে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, আপনি যত ক্যালোরি গ্রহণ করবেন এবং যত ক্যালোরি খরচ করবেন, তার ওপর নির্ভর করে আপনার ওজন বাড়বে বা কমবে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাদ্য শরীরের শক্তি খরচের হার বা এনার্জি এক্সপেন্ডিচার (energy expenditure) কমিয়ে দিতে পারে।
এর ফলে শরীর কম শক্তি ব্যবহার করে এবং অবশিষ্ট শক্তি চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে।
যেমন?
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি প্রতিদিন ২০০০ ক্যালোরি গ্রহণ করেন এবং একই পরিমাণ ক্যালোরি খরচ করেন। এই অবস্থায় তার ওজন স্থিতিশীল থাকবে।
কিন্তু যদি কোনো কারণে তার শরীরের শক্তি খরচের হার কমে যায় এবং সে মাত্র ১৭০০ ক্যালোরি খরচ করে, তাহলে বাকি ৩০০ ক্যালোরি শরীরে জমা হবে। এই জমাকৃত শক্তিই ধীরে ধীরে চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে ওজন বাড়ায়।
এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, কার্বোহাইড্রেট শরীরের এই শক্তি খরচের হার কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে একই ক্যালোরি গ্রহণ করেও ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।

খাদ্যাভ্যাসের ওপর প্রভাব
এই নতুন তথ্য আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সাধারণত আমরা মনে করি, শুধু কম খেলে বা ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করলেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, খাবারের ধরনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কার্বোহাইড্রেট আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ভাত, রুটি, আলু, নুডলস ইত্যাদি প্রধান খাদ্য। তাই এই গবেষণার ফলাফল সরাসরি আমাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে এর মানে এই নয় যে, কার্বোহাইড্রেট সম্পূর্ণভাবে পরিহার করতে হবে। বরং প্রয়োজন সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রোটিন, ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেট সব ধরনের পুষ্টি উপাদানই শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।
সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা
এই গবেষণাটি এখনো মানুষের ওপর নয়, বরং প্রাণীর ওপর করা হয়েছে। তাই মানুষের ক্ষেত্রে একই ফলাফল পুরোপুরি প্রযোজ্য হবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মানবদেহের বিপাকক্রিয়া অনেক বেশি জটিল এবং বিভিন্ন ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল।যেমন জেনেটিক্স, জীবনযাপন, শারীরিক পরিশ্রম ইত্যাদি।তাই এই গবেষণাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে, একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
শেষ কথা
সাম্প্রতিক এই গবেষণা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু ক্যালোরির ওপর নির্ভর করে না, বরং শরীর কীভাবে সেই ক্যালোরি ব্যবহার করে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাদ্য শরীরের শক্তি খরচের হার কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি ছাড়াই ওজন বৃদ্ধি সম্ভব।
