যুদ্ধে জেরবার জার্মানির অর্থনীতি

পোস্টটি শেয়ার করুন:

জার্মানির অর্থমন্ত্রী ও রক্ষণশীল ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন দলের সদস্য ক্যাথেরিনা রেইখে জার্মানির অর্থনীতি নিয়ে দুঃসংবাদ শুনিয়েছেন। তিনি মনে করছেন,  ইরান – যুক্তরাষ্ট চলমান যুদ্ধের কারণে এ বছর জার্মানির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারণার চাইতেও অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। মন্ত্রী বলেন, এই উত্তেজনা আমাদের অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি এখনো টালমাটাল।

জার্মানির অর্থমন্ত্রী ক্যাথেরিনা রাইখে

জানুয়ারিতে রেইখে যে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিলেন, তা এখন আর প্রাসঙ্গিক থাকছে না। তখনো যুদ্ধ শুরু হয়নি। আর এখন যুদ্ধে পুরো বিশ্ব টালমাটাল। সেই অবস্থায় জার্মানি ধীর কিন্তু স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করছিলো।

চলমান অস্থিরতায় জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয় কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির চিত্র নিয়ে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। অন্য পরিস্থিতিতে ধরা হয়েছে, যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হয়ে হবে এবং এই প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহন আবার স্বাভাবিক হবে। তবে বার্লিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বাস্তব কথাই তুলে ধরেন, কোন পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা বেশি এই কথা এখনো কেউ জানে না। তবে একটি বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে জানান। এ বছর মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে, যা প্রায় ২.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। পেট্রোল, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের বৃদ্ধি কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি, আশংকা করা হচ্ছে যে খাদ্যের দামও আরো বাড়তে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো জার্মান অর্থনীতিতেও নতুন করে সংকট তৈরি করেছে। রেইখে পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ স্থবিরতার পর যে সামান্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, তাও এখন ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি জ্বালানি সমস্যা তৈরি করেছে। এই ধাক্কা পারিবারিক ও সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বিশাল এক চাপ তৈরি করছে। জার্মানি এখন প্রকৃতিপক্ষেই হিমশিম খাচ্ছে। জার্মান বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি।

রাইখে সতর্ক করে বলেন, তবে এই সংকট যেন আমাদের সামনে থাকা কাজগুলোকে আড়াল না করে। আমাদের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি খুবই কম এবং সেটিকে বাড়াতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এখন গুরুতর চাপে রয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি বলতে এটাই বোঝায় যে, স্বাভাবিক উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার জিডিপির মাত্র ০.৫ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে দেশের সমৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাইখে আরও বলেন, জার্মানিতে শিল্পখাতে ক্রমশ চাকরি কমছে।অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো এমন দেশে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে ব্যবসার পরিবেশ বেশি অনুকূল। রাইখে নিজেও একসময় জ্বালানি কোম্পানির প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।তার ভাষায়, জার্মানির প্রবৃদ্ধির মূল দুর্বলতা কাঠামোগত। এক্ষেত্রে প্রতিযোগী অন্য দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করে ফেলেছে। অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের প্রবৃদ্ধির তালিকায় জার্মানি এখনো নিচের দিকেই অবস্থান করছে।

জার্মানির অর্থনীতি ঝুঁকিতে আছে

উচ্চ জ্বালানি মূল্যে হস্তক্ষেপে অনীহা

রাইখে উচ্চ জ্বালানি মূল্যের চাপ কমাতে বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ নিয়ে এখনো সন্দিহান। তার মতে জ্বালানির দামের সীমা নির্ধারণ বা কর কমানোর প্রস্তাবগুলো জার্মান অর্থনীতির জন্য বুমেরাং হতে পারে। রাইখের মতে, কর ছাড় কোনো জাদুর মতো হঠাৎ পাওয়া যায় না। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আগে উপার্জন করতে হয়।

চলমান সংকট মোকাবেলায় জার্মানির বিরোধী দল সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এসপিডির এসপিডির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য – তেল শিল্পে মুনাফার উপর বিশেষ কর আরোপ। কিন্তু রাইখে এইসব প্রস্তাব নিয়ে তার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এসব পদক্ষেপের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গুরুতর হতে পারে। তিনি বিশেষ করে এই কর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এর ফলে তেল শোধনাগারগুলো জার্মানি ছেড়ে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হতে পারে।

এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার ফলে দাম বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপিয়ান কমিশন ইউরোপজুড়ে অতিরিক্ত মুনাফার ওপর কর আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অবস্থানও জার্মান অর্থমন্ত্রী রাইখের মতোই সংশয়বাদী।

এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একবার এই ধরনের কর চালু করেছিল। সেই কর থেকে জার্মানির সরকারি কোষাগারে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২.৯ বিলিয়ন ডলার) আয় হয়েছিল। তবে সেই কর আরোপের বৈধতা নিয়ে এখনো ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ জাস্টিসে একটি মোকাদ্দমা চলমান রয়েছে।

ইরান – যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিশ্বের অর্থনীতিকে টালমাটাল করে তুলছে

জার্মানির সরকারি ঋণ বাড়ছে

জার্মানির শীর্ষ অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো রাইখের সাথে একমত। তাদের গবেষণা জানাচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যে প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা এখন অর্ধেকে নেমে আসবে।এ বছরের সামান্য যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ঋণনির্ভর সরকারি বিনিয়োগের ফল। তবে এর একটি মূল্য আছে।গবেষকদের মতে, এর ফলে সরকারি অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং এই দশকের শেষদিকে বড় ধরনের আর্থিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এর মানে হচ্ছে  ফেডারেল বাজেটে সুদের পরিশোধ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। ফলে ঋণের সুদ মেটাতে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা আর সামাজিক সেবা বা পেনশন খাতে ব্যবহার করা যাবে না।

অন্যদিকে এক জরিপ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জার্মানির অধিকাংশ কোম্পানিই নেতিবাচক প্রভাবের কথা চিন্তা করছে। তাদের মতে, আগে থেকেই চলমান বিদ্যমান সমস্যাগুলো এখন আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোও জার্মানিতে বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে। ৪০০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর এক জরিপে উঠে এসেছে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ধীরগতির ডিজিটাল রূপান্তর এই তিনটি বড় কারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

সুতরাং, যুদ্ধের পাশাপাশি এই তিন সমস্যাও জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে উপরে উঠতে দিচ্ছে না।

ডিডব্লিউ অবলম্বনে।


পোস্টটি শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *